সুইডেন থেকে উমরাহ হজ্জ্ব

32
১০ নভেম্বর ২০২৩ _ ফরহাদ প্রধান_লেখাটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে লেখা ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে সুতরাং এখানে কিছু তথ্যগত ভুল হতে পারে:
1. টিকিট ও ভিসা : আপনি যদি বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে সুইডেনে বসবাস করেন অথবা সুইডিশ পাসপোর্ট থাকে, তবে আপনি চাইলে সৌদি আরবের ই-ভিসা নিতে পারবেন ঘরে বসেই। এক বছর মেয়াদি এই ট্যুরিস্ট ভিসা নিতে ১৮০ ডলার খরচ হয় , এই মূল্যের সাথে ইন্সুরেন্স খরচ অন্তর্ভুক্ত। এর বাহিরে আপনি সৌদি পৌঁছে এয়ারপোর্ট থেকেও ভিসা নিতে পারেন তবে সেক্ষেত্রে অনেক কে নানাবিধ প্রশ্ন করতে দেখেছি। তাই আমার পরামর্শ আগে থেকেই ই ভিসা নিয়ে নেয়া ভালো। ভিসা পাবেন নুসুক ডট এস এ। এই ওয়েব সাইট থেকে। এছাড়া আপনি সৌদিয়া এয়ার লাইন্স এর টিকিট কাটলে তাদের মাধ্যমে ফ্রি ভিসা পেতে পারেন উমরাহ করার জন্য।
সরাসরি মক্কায় কোন এয়ারপোর্ট নেই। মক্কা থেকে প্রায় ৯০ কিমি দূরে এয়ারপোর্ট টি জেদ্দা শহরে অবস্থিত। এছাড়া মদিনাতে এয়ারপোর্ট আছে। সুইডেন থেকে আমার জানামতে কোন সরাসরি ফ্লাইট নেই। আমার পরামর্শ আপনি সুইডেন থেকে মদিনার টিকিট কাটুন। মাঝে আপনাকে যে কোন একটি দেশে ট্রান্সজিট নিবেন। এরপর মদিনা চলে যান। মদিনা থেকে মক্কা ট্রেনে যাবেন। ২ ঘন্টার মত সময় লাগবে। মক্কা থেকে জেদ্দা ট্যাক্সি বা ট্রেনে যেতে পারেন। জেদ্দা এয়ারপোর্ট এর ভিতরেই ট্রেন স্টেশন আছে। চাইলে জেদ্দা থেকে মক্কা বা মদিনা ট্রেনে যেতে পারবেন।
প্লেন এবং ট্রেনের টিকিট সুইডেনে ঘরে বসেই অনলাইনে কিনতে পারবেন। ঠিকমত কিনতে পারলে জেদ্দা থেকে মদিনা ১৩০ সৌদি রিয়েল এবং মদিনা থেকে মক্কা ১৭০ সৌদি রিয়েল দাম নিবে। মক্কা থেকে জেদ্দা ৪০ রিয়েল। ট্রেনে ব্যাগের নির্দিষ্ট সাইজ আছে। জনপ্রতি একটি বড় ব্যাগ নিতে দেয় , ব্যাগের সাইজ বেশি বড় হলে প্লেনের মত “চেক ইন লাগেজ” হিসেবে দিতে হবে। এটি আইনের কথা। তবে বাস্তবে অনেককে বড় বড় বিশাল ব্যাগ নিয়ে ট্রেন উঠতে দেখেছি , কেউ কিছু বলে না। তবে শুনেছি ভিড় থাকলে নাকি বড় ব্যাগ সাথে নিতে দেয় না , বাধ্যতামূলক চেক ইন লাগেজ হিসেবে দিতে হয়।
2. হোটেল : সৌদি আরবে সব শহরে হোটেল ভাড়া প্রতি রাতের জন্য ১৫০ সুইডিশ ক্রোনোর থেকে শুরু। তবে হোটেলের মান এবং দূরত্ব অনুযায়ী এই ভাড়া প্রতি রাতের জন্য ১৫ হাজার সুইডিশ ক্রোনোর পর্যন্ত হতে পারে। আমি নিজে মদিনাতে ফোর ষ্টার হোটেলে ছিলাম , যেখান থেকে মাত্র ১০ মিনিটে মসজিদে নবাবী তে হেটে যাওয়া যায়। প্রতি রাতের জন্য প্রায় এক হাজার সুইডিশ ক্রোনোর দিয়েছি। ফ্রি সকালে ভালো নাস্তা ছিল। মক্কা তে কাবা শরীফ থেকে ১০ মিনিটের হাটা দূরত্বে ফোর ষ্টার মানের হোটেল প্রতি রাতের জন্য ৫০০ সুইডিশ ক্রোনোর এ পেয়ে যাবেন। দিন এবং মাস ভেদে এই দাম অনেক উঠানামা করে।
আমার পরামর্শ কমপক্ষে ফোর ষ্টার হোটেল , হাটা দূরত্ব , ভালো টয়লেট এবং ফ্রি সকালের নাস্তা এবং ভালো এয়ার কন্ডিশন ব্যবস্থা আছে ,,এসব বিবেচনা করে রুম নিবেন।
সৌদি আরবে কোন সিঙ্গেল রুম আমি দেখিনি , তাই কমপক্ষে ২ সিটের রুম নিতে হবে আর তুলনামূলক জনপ্রতি বিবেচনা করলে চার সিটের রুম ভাড়া অনেক কম হয়।
আমার পরামর্শ সৌদি কোন শহরে যাবার আগেই কমপক্ষে ১ রাতের জন্য অনলাইনে হোটেল বুকিং করে যাবেন। যাতে শুরুতেই হোটেল খুঁজতে না হয়। এরপরের রাতগুলির জন্য সেখানে দেখেশুনে হোটেল নিতে পারেন। তবে পিক সিজিন যেমন ডিসেম্বর , জানুয়ারি , রোজার মাস এবং বৃহস্পতিবার রাত ইত্যাদি তে হোটেল পাওয়া কিছুটা কঠিন এবং ব্যয় বহুল। তাই আগে থেকেই বুকিং ডট কম , আগোডা, এয়ার বিএনবি ইত্যাদি দিয়ে হোটেল বুকিং করে রাখতে পারেন।
3. ট্যাক্সি আর ট্যাক্সি : মক্কা মদিনা শহরে মিটারে ট্যাক্সি চলতে আমি দেখিনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দরদাম করে উঠতে হবে। উবার , বোল্ট এবং কারিম নামে কিছু ট্যাক্সি এপ আছে , এগুলিতে ভাড়া দেখে নিন। এরপর নিজে দরদাম করে ট্যাক্সিতে উঠুন। মদিনা শহরের উল্লেখযোগ্য সব জায়গা মোটামুটি এক দিনেই দেখা সম্ভব। মক্কা শহরের উল্লেখযোগ্য সব জায়গা মোটামুটি দুই দিনেই দেখা সম্ভব। মক্কা বা মদিনার উল্লেখযোগ্য সব জায়গাতে যাওয়াকে “জিয়ারত” বলে। কোন কোন ট্যাক্সি ড্রাইভার ৫০ সৌদি রিয়েল আবার কেউ ৫০০ সৌদি রিয়েল চাইবে “জিয়ারত” এর জন্য। এখানে আসল ব্যাপার হলো কোন কোন জায়গায় যাবে এবং কি কি দেখাবে। আমার পরামর্শ আপনি যা যা দেখতে চান , তা আগে থেকেই প্রিন্ট করে কাগজে লিখবেন + কোথায় কত সময় থাকবেন সেটাও ঠিক করে নিবেন। এরপর সেই কাগজ দেখিয়ে ট্যাক্সির দরদাম করবেন। প্রচুর বাংলাদেশী ট্যাক্সি ড্রাইভার পাবেন , উনারা সবাই ভালো এবং বন্ধুভাবাপন্ন। আমার পরামর্শ বাংলাদেশী কাউকে খুঁজে বের করুন। এছাড়া একা হলে কোন গ্রূপের সাথে কথা বলে উনাদের সাথে সঙ্গী হতে পারেন। ট্যাক্সিতে ড্রাইভার সহ ৫ জন থেকে শুরু করে ১১ জনের গাড়ি পাবেন। এছাড়া ছোট বাস পাওয়া যায়। কিছু ট্যাক্সি “বাসের” মত সার্ভিস দেয় অর্থাৎ শেয়ারে উঠবেন। যদিও মক্কা মদিনায় চুরি ছিনতাই নেই , তবু ট্যাক্সিতে উঠার আগে পরিষ্কার করে দরদাম করে নিবেন ,নতুবা অযথা অনেক টাকা দিতে হতে পারে।
4. সিম কার্ড মোবাইল: সৌদি সরকারের আইন অনুযায়ী আপনি মোবাইলে ফেসবুক মেসেঞ্জার বা হোয়াটস এপ ইত্যাদি দিয়ে কল বা ভিডিও কল দিতে পারবেন না। তবে লিখে মেসেজ বা ছবি তুলে অথবা ভিডিও করে সেটি আদান প্রদান করতে পারবেন।
প্রথমে বলি মোবাইল সিম এর কথা। এয়ারপোর্টেই অনেকগুলি দোকান আছে , এইসব দোকানে আপনি আপনার পাসপোর্ট এবং ভিসার ছবি + আঙুলের ছাপ দিয়ে সিম কার্ড কিনতে পারবেন। অনেকগুলি মোবাইল অপারেটর কোম্পানি আছে এর মধ্যে “এস টি সি” কোম্পানির নেটওয়ার্ক ভালো। চল্লিশ সৌদি রিয়েল দিয়ে “এস টি সি” কোম্পানির “sawa visitor” সিম কিনতে পারেন। ১ঘন্টা ফ্রি কল (বাংলাদেশে কল ফ্রী) ৫ জিবি নেট এবং ২ সপ্তাহ ভ্যালিডিটি থাকে। বেশি টাকার প্যাকেজ কিনলে সুবিধা আরো বাড়বে। এছাড়া “airalo” এপ থেকে সম্পূর্ণভাবে অনলাইনে ই-সিম কিনতে পারেন। পাসপোর্ট, ভিসা, আঙুলের ছাপ কিছুই লাগবে না। অনেক কম দামের এই সিমে কোন নম্বর থাকে না তবে ইন্টারনেট থাকে। ভালো ভাবেই এই সিম কার্ড কাজ করে। মাত্র ৫ ডলার থেকে দাম শুরু। প্রায় সব ভালো হোটেলেই ওয়াই ফাই পাবেন। তবে হোটেলের ওয়াই ফাই সম্পূর্ণ নিরাপত্তাবিহীন। তাই সাবধানে ব্যবহার করবেন।
5. জমজমের পানি : মদিনা মসজিদে নবাবী এবং মক্কায় কাবা শরীফ সহ অসংখ্য মসজিদ এবং জায়গাতে জমজমের পানি পাবেন। ট্যাপ খুলে পাশে থাকা ওয়ান টাইম গ্লাসে করে ঠান্ডা এই পানি খেতে পারবেন অথবা বোতল ভরে পানি নিতে পারবেন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি। এছাড়া বিভিন্ন দোকানে ৫ লিটারের জমজমের পানির বোতল ১০ সৌদি রিয়েল দিয়ে কিনতে পারবেন।
সৌদিয়া এয়ার লাইন্সের টিকিট করলে আপনি ফ্রি ৫ লিটারের জমজমের পানি নিতে পারবেন শুধু সরাসরি ফ্লাইটে । মাঝে কোন ট্রানজিট থাকলে পানি নিতে দিবে না। সৌদিয়ার সরাসরি সুইডেনে কোন ফ্লাইট নেই। তবে বাংলাদেশে সরাসরি ফ্লাইট আছে। আজকাল যে কোন এয়ার লাইন্সে হাতে করে ২/৩ ছোট বোতল করে পানি নিয়ে আনতে পারবেন আশাকরি। অনেকে গোপনে চেক ইন লাগেজে জমজমের পানি নিয়ে আসে। এটি আইনগত ভাবে নিষিদ্ধ , তাই ধরা পরলে বা বোতল ফেটে গেলে ঝামেলা হতে পারে।
6. খাওয়া দাওয়া: কাবা শরীফের আশপাশে অনেক জায়গাতে ফ্রি খাবার দিতে দেখেছি , এছাড়া রাস্তায় বা অনেক মসজিদে ফ্রিজে ঠান্ডা পানি বা মিনারেল ওয়াটার এর বোতল থাকে , এগুলি ফ্রি। সৌদির প্রতিটি শহরে অসংখ্য বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট আছে , ফলে আপনি খুব সহজেই দেশি খাবার পাবেন। সব জায়গাতেই মোটামুটি হাটা দূরত্বেই বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট পাবেন , তাই চিন্তার কিছু নেই। তবে গুগুল করে বেশিরভাগ এইসব রেস্টুরেন্ট খুঁজে পাবেন না! সর্ব নিম্ন ৫ সৌদি রিয়েল দিয়ে বিশাল তন্দুর রুটি + সবজি দিয়ে এক বেলার খাবার খেয়েছি। আর সর্বোচ্চ প্রায় ৭০ রিয়েল দিয়ে ভাত মুরগি সবজি দই মিষ্টি দিয়েও এক বেলার খাবার খেয়েছি। মোটামুটি ২০ থেকে ৩০ রিয়েল দিয়ে ভালোভাবেই একবেলার খাবার খেতে পারবেন।
আরবি বেশ কিছু রেস্টুরেন্টে নানাবিধ আরবি খাবার খেয়েছি। বেশিরভাগ খাবার খেতে আমার খুব ভালো লেগেছে। এছাড়া সেমাই সুজি পিঠা জাতীয় আরবি নাম না জানা বেশ কিছু খাবার খেয়েছি। চা কফি জাতীয় কিছু আরবি ড্রিংক আছে , খেজুর দিয়ে খেতে হয় , সেগুলিও অনেক মজার। আমার কাছে কোথাও কোন খাবার খেতে খারাপ লাগেনি।
7. ইহরাম এবং পোশাক : উমরাহ করার জন্য পুরুষদের ২টি তোয়ালে জাতীয় পোশাক পরতে হয়। এটিকে “ইহরাম” বলে। একটি কোমরে অনেকটা লুঙ্গির মত এবং অন্যটি গায়ে চাদরের মত পরতে হয়। আপনি যদি প্রথমে মদিনা যান , তবে বাসা থেকে ইহরাম না পরলেও হবে, এমনকি ইহরাম না কিনলেও হবে। আপনি মদিনাতে পৌঁছে সেখান থেকে ভালো মানের ইহরাম, বেল্ট এবং স্যান্ডেল কিনতে পারবেন। অনেক অনেক দোকান আছে। মদিনা থেকে মক্কা ট্রেনে গেলে আপনার হোটেল থেকেই ইহরাম পরে নিন। আর মদিনা থেকে মক্কা বাসে বা ট্যাক্সিতে গেলে মাঝে একটি বিশেষ জায়গাতে বাস বা ট্যাক্সি থাকবে এবং সেখানে আপনি এহরাম পরতে পারবেন। আর যদি আপনি সুইডেন থেকে সরাসরি উমরাহ করতে মক্কায় যান। তবে মাঝে যেখানে বা যেদেশে ট্রানজিট থাকবে সেখানে ইহরাম পরতে পারবেন। সেক্ষেত্রে সুইডেনের স্টকহোমে এহরাম এর দোকান আছে , এছাড়া এমাজন এবং ফিন্দিক জাতীয় কিছু অনলাইনের দোকান থেকেও এহরাম এবং অনুসাঙ্গিক জিনিস কিনতে পারবেন।
মনে রাখবেন খুব গরম এবং বারবার বিভিন্ন মসজিদে যাবার জন্য জুতা না পরাই ভালো , বরং ভালো মানের স্যান্ডেল পরা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। নতুন সেন্ডেলে পায়ে ফোস্কা হয়ে যায় , তাই পুরাতন আরামদায়ক সেন্ডেল সাথে নিতে পারেন। মদিনায় উহুদ পাহাড় এবং মক্কায় হেরা পাহাড় ইত্যাদিতে উঠাতে চাইলে অবশ্যই পাহাড়ে উঠার মত ভালো জুতা/স্যান্ডেল সাথে নিবেন। মক্কা মদিনায় ফুটপাতে থেকে শুরু করে ভালো ভালো শপিং মল আছে , সেখান থেকে পাঞ্জাবি , আলখাল্লা , বোরকা , সুগন্ধি, তসবি , জায়নামাজ, সোনার বা হীরার অলংকার ইত্যাদি কিনতে পারবেন। সব দাম এবং সব মানের জিনিস পাবেন।
8. দিন এবং রাত : সৌদিতে দিনের বেলা প্রচন্ড গরম থাকে। তাই এই গরমে বাহিরে ঘুরাঘুরি কিছুটা কস্টকর। আপনি চাইলে এশার নামাজের পর ঘুরাঘুরি করতে পারেন। অনেক শপিং মল থেকে শুরু করে রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি রাতে দিনে প্রায় ২৪ ঘন্টাই খোলা থাকে। গভীর রাতে বাজার করা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার, চুরি ছিনতাই এর ভয় নেই। তাই রাতে বের হতে পারেন।
9. দেখার মত কি কি আছে ?
মসজিদে নবাবী: প্রথমেই মদিনার কথা বলি , এখানেই আছে মসজিদে নবাবী। এটি কেন্দ্র করেই মক্কা। এখানে যতটা বেশি সম্ভব থাকার চেষ্টা করতে পারেন । মসজিদ টি ২৪ ঘন্টাই খোলা থাকে , যে কেউ ভিতরে গিয়ে নামাজ পরতে বা দেখতে পারে। তবে এই মসজিদের ভিতরে থাকা হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর কবর জিয়ারত করতে চাইলে আগে থেকেই নুসুক এপ দিয়ে টাইম বুকিং দিবেন নতুবা সেখানে ঢুকতে দিতে নাও পারে। মসজিদের পাশেই অনেক কিছু আছে দেখার মত। মহানবীর জীবন কাহিনীর ভিডিও দেখতে পারেন , টিকিট ৪০ রিয়েল। এছাড়া মিউজিয়াম আছে।
উহুদ পাহাড় : এই উহুদ পাহাড় এবং হানজালা রাঃ সহ ৭০ জন সাহাবার কবর পাশেই অবস্থিত। মূল শহরের কাছেই , গাড়িতে ১০ মিনিট সময় লাগতে পারে। এখানে বেশ কিছু ভালো খাবারের দোকান আছে , তবে অনেক ভিক্ষুক থাকায় কিছুটা বিব্রত হতে পারেন।
মদিনা : মসজিদে কুবা, মসজিদে কিবলাতাইন বা দুই কেবলার মসজিদ, উসমান রাঃ এর বাগান, জুম্মা মসজিদ , সাত মসজিদ/খন্দক ইত্যাদি অনেকগুলি জায়গাতে যেতে পারেন , এগুলি সবগুলিতে গাড়ি বা ট্যাক্সিতে যেতে ১০ মিনিট সময় লাগতে পারে। জিনের রাস্তা যেখানে গাড়ি নিজে থেকেই উপরের দিকে উঠে , সেখানে যেতে ২০ মিনিট সময় লাগতে পারে। সেখানে গিয়ে ১০ রিয়েল দিয়ে উঠের পিঠেও উঠতে পারবেন। এছাড়া মদিনা শহরে অনেক মিউজিয়াম এবং বিখ্যাত মসজিদ আছে , সেগুলি দেখতে পারেন। একদিনেই সবগুলি দেখা সম্ভব। এছাড়া শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে প্রায় ২ ঘন্টা লাগবে যেতে আছে বদর যুদ্ধ ক্ষেত্র, সেটাও অনেকে দেখতে যান , তবে আমি যাই নাই। শহরের একদম আশেপাশে বেশ কিছু খেজুরের বাগান আছে , সেখান থেকে সরাসরি দ্বিগুন দামে টাটকা খেজুর কিনতে পারবেন। রাশেদ এবং আলনূর নামে ২ টি বড় শপিং মূল আছে এই শহরে। ঘুরে দেখতে পারেন। যদিও অনেক বড় তবে আমার কাছে আহামরি কোন কিছু মনে হয় নাই।
কাবা শরীফ এবং এর আশপাশ : কাবা শরীফ কে কেন্দ্র করেই মক্কা শহর। কাবা শরীফেই আপনাকে মূল উমরাহ করতে হবে। এটি ২৪ ঘন্টাই খোলা থাকে। তবে বৃহস্পতিবার রাত এবং শুক্রবারে খুব বেশি ভিড় থাকে। উমরাহ করার জন্য চাইলে নুসুক এপ দিয়ে টাইম বুকিং দিয়ে রাখতে পারেন , তাহলে নিশ্চিতভাবেই ঢুকতে পারবেন। বুকিং না দিয়েও উমরাহ করতে পারবেন। তবে বেশি ভিড় হলে অনেক সময় কিছুটা ঝামেলা হয়। কাবা শরীফের সাথেই আছে , দুটি পাহাড় , মারওয়া এবং সাফা পাহাড় , যা বর্তমানে দেখলে মনে হয় মাটির নিচে। উমরাহ করার জন্য এই দুই পাহাড়ের মাঝে আপনাকে হাটতে এবং দৌড়াতে হবে। উপরে সবুজ লাইট দেয়া হয়েছে , যেখানে দৌড়াতে বা জোরে হাটতে হয়। এই দুই পাহাড় এবং মাঝখানে হাঁটার রাস্তা পুরোটাই এয়ার কন্ডিশন। তাই চিন্তার কিছু নেই , এছাড়া আছে জমজমের পানি খাবার সুব্যবস্থা। কাবা শরীফের একদম পাশেই আছে ক্লক টাওয়ার নাম হাইরাইজ বিল্ডিং। যার মধ্যে বেশ কিছু হোটেল আছে। আছে শপিং মল এবং বাংলাদেশী অনেকগুলি রেস্টুরেন্ট। উমরাহ শেষ হলে এই শপিং মলে এসে মাথার চুল ফেলে দেবার জন্য বেশকিছু সেলুন আছে। লোক বুঝে ৫ থেকে ২০ রিয়েল নেয় মাথা কমানোর জন্য, সার্ভিস ভালো না। চাইলে আপনি আপনার হোটেলের কাছের সেলুন থেকে আরো আরামদায়ক ভাবে এবং কম খরচে মাথা কামাইতে পারবেন। খাদিজা রাঃ এর কবর, মসজিদে জ্বীন সহ বেশকিছু নামকরা ঐতিহাসিক মসজিদ এবং নিদর্শন কাবা শরীফের একদম পাশেই অবস্থিত। এগুলিতে আপনি ১০ মিনিট হেটেই যেতে পারবেন।
মক্কা শহর এবং এর আশপাশ : মক্কা শহরেই এক পাশে অবস্থিত হেরা পর্বত। এটির কাছাকাছি গাড়িতে করে যেতে পারেন। অনেকটাই উচা। এরপর মূল পাহাড়টি অবস্থিত। পায়ে ভালো জোর এবং ভালো জুতা থাকলে এই পাহাড়ের একদম চুড়ায় উঠতে পারবেন। সেখানে অনেকেই নামাজ পরে। খুব গরম থাকলে , আপনি অবশ্যই সাথে পানি , ছাতা এবং লাঠি নিয়ে নিবেন। ওখানে অনেক দোকান আছে সেখান থেকেও কিনতে পারবেন।
শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে মিনা এবং আরাফাত আছে। সেখানে যাবার পথে শয়তান কে পাথর মারার জায়গাটি দেখতে পাবেন। তবে হজ্জ্ব মৌসুম ছাড়া এটি বন্ধ থাকে। মিনাতে অনেক তাবু দেখতে পারবেন তবে সেগুলিও হজ্জ্ব মৌসুম ছাড়া বন্ধ থাকে। এরপর আরো কিছু দেখার পরে যেতে পারেন আরাফাত ময়দান। মূল হজ্জ্ব করার সময় মিনা আরাফাত যাওয়া বাধ্যতামূলক। আরাফাতের ময়দান দেখে ফেরার পথে আরো কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে পাবেন।
কোন একদিন দুপুরের পরে যাবেন Taif দেখতে। এখানে যেতে প্রায় দুই ঘন্টা লাগতে পারে। এটি অনেক উঁচু পাহাড়ের উপরে অবস্থিত। গাড়ি নিয়েই পুরোটা পথ যেতে পারবেন। সময় পেলে উঁচু পাহাড়ের “রোপ ওয়ে” আছে সেটিতে উঠবেন। যাবার পথে “বুড়ির বাড়ি” মসজিদ দেখতে পাবেন। এছাড়া সেই শহরে Abdullah In Abbas এর কবরস্থান এবং সাথে খুব সুন্দর একটি মসজিদ আছে। রাস্তার পাশে অনেক সুন্দর খেত খামার এবং বাগান দেখতে পাবেন। এছাড়া মসজিদের পাশে সদ্য তোলা খেজুর আঙ্গুর ডালিম ইত্যাদি কিনতে পারবেন। এই শহরে রাতের খাবার খেয়ে ফিরতি পথে “হাদা রোড” এর অসাধারন আলোকসজ্জা দেখতে পাবেন। টাকার সমস্যা না থাকলে Taif শহরে অনেক ভালো ভালো রিসোর্ট আছে , সেখানে এক রাত থাকতে পারেন। পাহাড়ের উপরে খোলা বাতাসে খেজুর গাছের নিচে নামাজ পরে আলাদা একটি অনুভূতি পাবেন।
জেদ্দা শহর : আমার ব্যক্তিগতভাবে এই শহরটি পছন্দ হয় নাই। আল বালাদ নামে একটি এলাকা আছে , এটি মূলত গুলিস্থানের সৌদি রূপ। এটি পুরান জেদ্দা। অনেক বাংলাদেশি দোকান , ফুটপাথের দোকান এবং গোল্ড এর অনেক দোকান আছে। এখান থেকে হাটা দুরুত্বে খুব সুন্দর একটি মসজিদ আছে , নাম জাফালি। তবে অনেক সময় এটি বন্ধ থাকে। জেদ্দা শহরের একপাশে সমুদ্র। আর এই সমুদ্রের পাড়ে বসে থাকার জন্য খুব সুন্দর কিছু জায়গা আছে, হালকা খাবারের ব্যবস্থা আছে । রাতে রংবেরং এর আলো জ্বালিয়ে ফোয়ারায় পানি চালু করা হয়। দেখতে খুব ভালো লাগে। জেদ্দায় বেশ কিছু শপিং মল আছে। তবে একটি থেকে অন্যটি বেশ অনেকটা দূরে অবস্থিত। এয়ারপোর্টের অনেক কাছে “রেড সি” শপিং মল থেকে কেনাকাটা করতে পারেন।
আমার কাছে মনে হয়েছে উমরাহ হজ্জ্ব করতে সব মিলিয়ে ১০ দিন হলেই হবে। সুইডেন থেকে গ্রূপে বা এজেন্সির মাধ্যমে গেলে আনুমানিক জনপ্রতি ২৫ হাজার ক্রোনোর এবং নিজে নিজে একা গেলে আনুমানিক ৩৫ হাজার ক্রোনোর এর মত খরচ হতে পারে।
১ সৌদি রিয়েল = ৩ সুইডিশ ক্রোনোর = ৩০ বাংলাদেশী টাকা ,,,এভাবে হিসাব করলে বুঝতে সহজ হবে।
10. টয়লেট : সৌদি আরবে প্রতিটি মসজিদে ওযু করার ভালো ব্যবস্থা দেখেছি। সুতরাং এই ব্যাপারে চিন্তার কিছু নেই। সব জায়গাতেই হাটা দূরত্বে মসজিদ আছে। সকল মসজিদে টয়লেট করার ব্যবস্থা আছে। সেগুলি আবার ২৪ ঘন্টাই খোলা থাকে। তবে সমস্যা হলো , বেশিরভাগ টয়লেট হচ্ছে লো কমোড বা বাংলাদেশের টয়লেটের মত। ফলে আমরা যারা হাই কমোড ব্যবহারে অভস্থ তাদের জন্য নিচু হয়ে বসা কিছুটা কস্টকর। তবে অনেক জায়গাতে হাই কমোড আছে। প্রতিটি টয়লেটে পানির ব্যবস্থা এবং হ্যান্ড সওয়ার থাকে। ভালো ব্যবস্থা না থাকলে একটি নল দিয়ে পানির ব্যবস্থা আছে , যা দিয়ে শৌচ কর্ম করতে পারবেন। তবে হাই কমোড টয়লেট সহ কোন পাবলিক টয়লেটে আমি টয়লেট পেপার দেখতে পাই নাই। হাই কমোড গুলি পানিতে ভিজা থাকে। তাই আমার পরামর্শ হলো , পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করতে চাইলে সাথে করে পর্যাপ্ত টয়লেট পেপার রাখবেন।
(আপনারা অন্যদের অভিজ্ঞতার সাথেও মিলিয়ে নিবেন তথ্যগত ভুল থাকতে পারে - Forhad Prodhan  এর পাতা থেকে) উমরাহ হজ্জ্ব করার নিয়ম কানুন , সুবিধা ইত্যাদি নিয়ে কোন কিছু আমি লিখবো না। কারন আমি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞানী মানুষ না , খুব কম জানি। সুতরাং ধর্মীয় কোন প্রশ্ন থাকলে দয়া করে যিনি এই বিষয়ে জানেন তার কাছে যান। আমি শুধু আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখবো।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here